873>|| গঙ্গাসাগর তীর্থ ||
<----আদ্যনাথ--->
সকল তীর্থ বার বার,
গঙ্গাসাগর একবার।
মকরসংক্রান্তির সাগরে স্নান,
তারপরে হাত খুলে করো দান।
গঙ্গা সাগরের মেলা
পুন্য স্নানের মেলা।
যেস্থানে গঙ্গা মিশেছে বঙ্গোপসাগরে,
মেলা বসে কপিল মুনির আশ্রমটি ঘিরে।
গঙ্গাসাগরের বেলাভূমি,
মানুষের মিলন তীর্থ ভূমি।
এখানে আশেপাশে আছে 51 দ্বীপ,
580 বর্গ কিমি জুড়ে সাগরদ্বীপ।
ভগীরথ এনেছিল গঙ্গাকে মর্ত্যে,
সগর রাজার পুত্রদের পুনর্জীবিত করতে।
অনন্তসাগর মাঝে কপিল মুনির মন্দিরটি,
ভক্তের সমাগমেপূর্ন তিথি মকরসংক্রান্তি।
এহেন মহা তীর্থে জীবনে একবার,
বিশ্বাস জীবনমুক্তির উপায় নাই আর।
পুণ্যতোয়া গঙ্গা হিমালয় থেকে সাগরে,
বয়ে চলেছে ভারতভূমিতে মাতৃ রূপে।
ভারতের সকল তীর্থের আঙ্গন ধুয়ে,
মাতৃ রূপে গঙ্গা মিশেছে সাগরে গিয়ে।
তাইতো মহাতীর্থ এই সাগর সঙ্গম,
যেথায় ধ্যানমগ্ন মানবশ্রেষ্ঠ মুনির আশ্রম।
পৌষের প্রচন্ড শীতকে উপেক্ষা করে,
লক্ষ লক্ষ মানুষ মিলেছে সাগর সঙ্গমে।
মকরস্নানে ধন্য করতে মানব জীবন,
ধন্য প্রকৃতির মকরসংক্রান্তি পাবন।
এমন পুণ্য ক্ষণে মনে পরে,
ঋষি বঙ্কিমচন্দ্রের সাগর দর্শনের উক্তিটি,
("কপালকুণ্ডলা" উপন্যাসে নবকুমারের
সেই উক্তি,)
'' দূরাদয়শ্চক্রনিভস্য তন্বী তমালতালীবনরাজিনীলা।
আভাতি বেলা লবণাম্বুরাশের্দ্ধারানিবদ্ধের কলঙ্করেখা॥”
<---আদ্যনাথ-->
=========================
|| গঙ্গাসাগরের অমর কথা ||
<---আদ্যনাথ--->
সত্যম্ শিবম্ সুন্দরম্ ||
শিব স্বয়ং পরমেশ্বর তিনিই পরম ব্রহ্ম। তিনিই সত্য, সুন্দর এবং সদা মঙ্গলময়।
একদা শিব গোলোকে শিঙ্গা ও ডম্বরু সহযোগে তাঁর পঞ্চমুখে বিভোর হয়ে রামনাম গান করছিলেন। লক্ষ্মীর সঙ্গে বসে সেই গান শুনতে শুনতে বিষ্ণু দ্রবীভূত হয়ে যান এবং তার ফলে পতিত-পাবনী গঙ্গার জন্ম হয়। ব্রহ্মা পরম আদরে গঙ্গাকে নিজ কমণ্ডুলুতে রাখেন।জীব ও জগতের উদ্ধারের জন্য ত্রিলোক পাবনী গঙ্গাদেবীর এই জগতে আগমন। ভগীরথ সগর সন্তানগণের উদ্ধারার্থে কঠোর তপস্যা করে গঙ্গাকে ভূতলে নিয়ে আসেন। সূর্যের পুত্র মনু। মনুর ছেলের মধ্যে একজন ছিল ইক্ষাকু। মনুর ছিল এক মেয়ে ইলা। এই ইলার সাথে বিয়ে হয় চন্দ্রের ছেলের। আর এইভাবে বিখ্যাত সূর্য বংশ আর চন্দ্র বংশের প্রতিষ্ঠা হয়। দশরথের ছেলে রাম ছিল এই সূর্য বংশের। কিন্তু তার আগে আমরা পাই এই সূর্য বংশে এক সগর রাজাকে।
সগর রাজার দুই পত্নী – প্রভা আর ভানুমতী। দুজনেই সন্তান কামনা করে পূজা করে বর লাভ করেন।একজনের ষাট হাজার পুত্র হবে, যারা করিতকর্মা হবে, আর আর একজনের একটি মাত্র পুত্র হবে কিন্তু তার প্রজন্মের নাম বিশ্ববিদিত হবে। প্রভা একটি অলাবু প্রসব করেছিলেন যা ঘি'য়ে ডুবিয়ে রাখার পর তার থেকে ষাট হাজার পুত্র হয়েছিল। ভানুমতির একটাই ছেলে হল, যার নাম অসমঞ্জ। এই অসমঞ্জ ছিল অত্যন্ত অত্যাচারী। তার একটা সখ ছিল নবজাত শিশুদের ধরে নদীতে ছুঁড়েফেলা যাতে তারা ডুবে মারা যায়। এই অসমঞ্জের পরে আমরা যদি সপ্তদশ পুরুষে যাই, তবে আমরা পাব রাজা রাম কে।
সগর রাজা একবার এমন এক অশ্বমেধ যজ্ঞ শুরু করলেন যা সম্পন্ন করতে পারলে তিনি দেবরাজ ইন্দ্রের সমান শক্তিশালী হয়ে যাবেন। এতে ঈর্ষান্বিত হয়ে ইন্দ্র যজ্ঞের পবিত্র ঘোড়া অপহরণ করেন এবং ঘোড়াটিকে কপিল মুনির আশ্রমের কাছে বেঁধে রেখে চলে যান। মুনি তখন ধ্যানমগ্ন থাকায় কিছুই জানতে পারেন না। তখন কপিল মুনির আশ্রমের পাশে গঙ্গা বলে কোন নদী ছিল না। কপিলমুনি ছিলেন ভগবান বিষ্ণুর চব্বিশ গৌণ অবতারের একজন। যিনি সাংখ্য দর্শন এবং যোগের মাহাত্ম্য প্রচারের উদ্দেশ্যেই আবির্ভূত হন। ইনিই একমাত্র মুনি যে জন্ম হওয়া মাত্রই যোগশক্তি লাভ করেন।
সগর তাঁর ষাট হাজার পুত্রকে অশ্বের অন্বষণে প্রেরণ করেন। তাঁরা অনেক খুঁজে খুঁজে অবশেষে ধ্যানমগ্ন মহর্ষি কপিলের আশ্রমে ঘোড়াটিকে দেখতে পান। মহর্ষিকে চোর সন্দেহ করে তারা সবাই চিৎকার করে তাঁকে গালমন্দ করতে থাকে। এর ফলে কপিল মুনির বহু বছরের ধ্যান ভঙ্গ হয়ে যায় এবং মহর্ষি তাদের দিকে ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে তাদের ভস্ম করে দেন। সগর রাজার ষাট হাজার সন্তানের আত্মা পারলৌকিক ক্রিয়ার অভাবে প্রেতরূপে ওইখানেই আবদ্ধ হয়ে থাকে।
সগরের নাতি, অসমঞ্জের ছেলে অংশুমান তার জ্যাঠাদের খুঁজতে খুঁজতে গিয়ে কপিলের আশ্রমে হাজির হলেন। কপিল মুনি তাঁকে বললেন, হ্যাঁরে বাপ, তাঁদের তো আমি ছাই করে ফেলেছি। অংশুমান কপিল মুনির কাছে গিয়ে অনেক কাকুতি মিনতি করতে থাকেন তাদের প্রেতরূপ থেকে মুক্তি দেবার জন্য। তখন মুনি তাঁর উপর একটু সদয় হন এবং তাঁকে বলেন তোমার বংশের কেউ যদি স্বর্গ থেকে মা গঙ্গাকে নিয়ে এসে এদের অস্থির উপর দিয়ে বইয়ে নিয়ে যেতে পারে, তবে তারা প্রেতরূপ থেকে মুক্তি পেয়ে স্বর্গলোকে গমন করবে। অংশুমান গেল ফেরত, গঙ্গা কোথায় ইত্যাদির খোঁজ খবর নিয়ে তাঁকে নিয়ে আসার বন্দোবস্ত করতে। কিন্তু গঙ্গাকে নিয়ে আসা কি সোজা কথা। তাঁকে পৃথিবীতে নামাতে হবে, আর তার পরে সেই কপিল মুনির আশ্রম পর্যন্ত নিয়ে যেতে হবে।
ভগীরথ যখন জন্মাল তখন কোশল রাজ্যের আর বিশেষ কিছু আভিজাত্য নেই। অল্প বয়সেই নিঃসন্তান অবস্থায় অসমঞ্জের নাতি রাজা দিলীপ ও মারা যান। তখন রাজার দুই স্ত্রী বংশের ধারা রক্ষা করার জন্য অষ্ট্রাবক্র মুনির কাছে গেলে মুনির পরামর্শে দিলীপের দুই স্ত্রী শারীরিক মিলন করে। তাদের গর্ভে একটি মাংসপিণ্ড উৎপন্ন হয়। অষ্ট্রাবক্র মুনি সেই মাংসপিণ্ড দ্বারা একটি পুত্র সন্তান তৈরি করে মন্ত্রবলে প্রাণ সঞ্চার করে নামকরণ করেন ভগীরথ।
(সগরপুত্র অসমঞ্জের নাতি দিলীপের দুই বিধবা রাণীর ভগে ভগে কেলির ফলে ভগীরথের জন্ম হয় এবং ওইভাবে জন্ম হওয়ার জন্যই তার নাম ভগীরথ। ভগে ভগে জন্ম হেতু ভগীরথ নাম।)
ভগীরথ গঙ্গাকে মর্ত্যে আনতে সংকল্প করেন এবং ইন্দ্র, মহেশ্বর, নারায়ণ ও ব্রহ্মার শরণাপন্ন হন। অষ্ট্রাবক্র মুনির আদেশে হিমালয়ে গিয়ে বিষ্ণুকে তপস্যা করে সন্তুষ্ট করেন গঙ্গাকে মর্তে অবতরণের জন্য।
ভগবান ভগীরথকে বলেন গঙ্গার প্রবল বেগ স্বর্গ থেকে মর্তে আছড়ে পড়লে মর্তলোক ধ্বংস হয়ে যাবে। তার এই প্রবল গতিরোধ করার জন্য তুমি শিবের আরাধনা কর।ভগীরথ শিবকে তপস্যায় তুষ্ট করলে তিনি রাজি হলেন গঙ্গার প্রবল বেগকে তাঁর জটাজালে আবদ্ধ করতে। এরপর ক্রুদ্ধ গঙ্গা প্রবল বেগে শিবের মস্তকে পতিত হন। কিন্তু শিব শান্তভাবে নিজ জটাজালে গঙ্গাকে আবদ্ধ করেন এবং ছোটো ছোটো ধারায় তাঁকে মুক্তি দেন। এইজন্য শিবের আরেক নাম গঙ্গাধর।
ভগীরথ আগে আগে শাঁখ বাজিয়ে এগিয়ে চলেন আর পিছনে পিছনে গঙ্গানদী তাকে অনুসরণ করে চলে। ভগীরথকে অনুসরণ করার সময় গঙ্গা ঋষি জহ্নুর আশ্রম প্লাবিত করেন। উগ্রতপা জহ্নু ক্রুদ্ধ হয়ে গঙ্গার সমস্ত জল পান করে ফেলেন। তখন ভগীরথ গঙ্গার মুক্তির জন্য ঋষির কাছে প্রার্থনা করতে থাকলে নিজের জঙ্ঘা বা জানু চিরে তিনি গঙ্গাকে মুক্তি দেন। তাই গঙ্গার অপর নাম হয় জাহ্নবী। ভগীরথ তাঁকে নিয়ে আসায় তিনি ভাগীরথী নামে পরিচিত হন।
এরপর ভগীরথ রাস্তা দেখিয়ে গঙ্গাকে নিয়ে যাওয়া শুরু করলেন। সেই গোমুখ থেকে হরিদ্বার, সেখান থেকে কাশী। তার পরে নবদ্বীপ হয়ে কপিল মুনির আশ্রম। এইভাবে গঙ্গা এই মকর সংক্রান্তির দিনেই কপিল মুনির আশ্রমের পাশ দিয়ে সগর রাজার ষাট হাজার পুত্রের অস্থির উপর দিয়ে বয়ে যান। গঙ্গার পবিত্র স্পর্শে তাদের সব জ্বালা জুড়িয়ে যায় এবং তারা প্রেতরূপ থেকে মুক্ত হয়ে স্বর্গলোকে গমন করে।
সগর রাজার সেই অশ্বমেধ যজ্ঞ আর হয়নি, কিন্তু সেই থেকে প্রত্যেক বছর কপিল মুনির আশ্রমে গঙ্গাসাগর মেলা হচ্ছে। যেদিন সগর রাজার ষাট হাজার সন্তানের পরম মুক্তি ঘটেছিল সেই পবিত্র মকর সংক্রান্তির দিনে লক্ষ লক্ষ মানুষ এখানে আসেন মুক্তির আকাঙ্ক্ষা নিয়ে।প্রকৃতপক্ষে আপামোর ভারতবাসীর বিশ্বাস, গঙ্গাসাগর তীর্থে যে একটিবার স্নান করবে সে জীবনের সমস্ত পাপ মুক্ত হয়ে পরম মোক্ষ লাভ করবে। এমনটি আর কোন স্থানে নেই। শাস্ত্রে বলা হয়েছে, --
সর্বত্র পাবনী গঙ্গা ত্রিশু স্থানেশু দুর্লভ ||
গঙ্গাদারে,প্রয়াগে চ গঙ্গাসাগর সঙ্গমে ||
গঙ্গায়াং চ জলে মোক্ষ, বারাণস্যাং জলে স্থলে |
জলে স্থলে অন্তরীক্ষে গঙ্গায়াং গঙ্গাসাগর সঙ্গমে ||
গঙ্গা সর্বত্রই পবিত্র। কিন্তু গঙ্গাদার (হরিদ্বার), প্রয়াগ ও গঙ্গাসাগর এই তীর্থে সে শ্রেষ্ঠ। পুরানকাররা বলেন, প্রয়াগে মৃত্যু হলে মোক্ষ লাভ হয়, বারাণসীর জলে, স্থলে মৃত্যু হলে মোক্ষ লাভ হয়। কিন্তু গঙ্গাসাগরে জলে, স্থলে, অন্তরীক্ষেও মৃত্যু হলে মহামুক্তি লাভ হয়।
গঙ্গাসাগর মেলার প্রধান আকর্ষন শ্রীকপিল মুনির মন্দির। শ্রীমন্দিরে কপিল মুনি পদ্মাসনে যোগারূঢ় অবস্থায় উপবিষ্ট। তাঁর বাম হাতে কমণ্ডুল, ডান হাতে জপমালা, শিরোদেশে পঞ্চনাগ ছত্রবৎ অবস্থিত। শ্রীকপিল মুনির দক্ষিণে শ্রীগঙ্গাদেবীর বিগ্রহ। ইনি চতুর্ভুজা এবং মকর বাহন। শ্রীহস্ত সমূহে শঙ্খ, পদ্ম, অমৃতকুম্ভ ও বরাভয়। সম্মুখে মহাতাপস ভগীরথ। কপিল মুনির বিগ্রহের বামদিকে সগর রাজ ভক্তি বিনম্র চিত্তে করজোড়ে অবস্থান রত।
গঙ্গাসাগর সঙ্গমে মকর স্নানের বিশেষ মন্ত্র --
“ত্বং দেব সরিতাং নাথ ত্বং দেবী সরিতাম্বরে।
উভয়োঃ সঙ্গমে স্নাত্বা মুঞ্চামি দুরিতানি বৈ।।”
এই মন্ত্র উচ্চারণ করে স্নান করা অবশ্য কর্তব্য। স্নানের শেষে দান কার্য জরুরী।
মা গঙ্গা, সবার মা হলেন, পাপী, তাপী, আপামর জনসাধারণের শান্তির আশ্রয়। কেউ যদি ভক্তি শ্রদ্ধা সহকারে “গঙ্গা গঙ্গা” বলে ডাকেন সকল প্রকার পাপ থেকে মুক্ত হয়ে তিনিও ভগবান বিষ্ণুর লোকে গমন করেন।
(অনুবাদও সংকলন)
<---আদ্যনাথ রায় চৌধুরী--->
==========================